যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির পাশাপাশি এখন সংগঠনের (রাজনৈতিক দল) বিচার করা যাবে। গতকাল শেষ মুহূর্তে সংগঠনের বিচারের বিধান যুক্ত করে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) (সংশোধন) অ্যাক্ট, ২০১৩’ গতকাল সংসদে পাস হয়েছে। মহাজোটের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন আইনটি পাসের প্রক্রিয়াকালে যুদ্ধপরাধের জন্য রাজনৈতিক দলের বিচারের বিধান যুক্ত করার সংশোধনী আনলে আইনমন্ত্রী তা গ্রহণ করেন। এ বিধান যুক্ত হওয়ার ফলে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে যে কোনো রাজনৈতিক দলের বিচারের পথ উন্মুক্ত হলো।
গতকাল পাস হওয়া বিলে এই গুরুত্বপূর্ণ বিধান যুক্ত ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে নতুন যেসব বিধান যুক্ত হলো তা হচ্ছে—আইনের অধীনে গঠিত ট্রাইব্যুনালের বিচারের রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিতের পাশাপাশি সরকার এবং বাদীও আপিল করতে পারবে, আপিল বিভাগে দায়ের হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি করতে হবে এবং আইনটি ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গতকাল অধিবেশনে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে সর্বসম্মতিক্রমে তা পাস হয়। বিকাল ৪টা ৫০ মিনিটে পাসের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ৫টা ২ মিনিটে বিলটি পাস হয়। বিলটির ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে প্রেরণের কোনো নোটিশ জমা পড়েনি। বিরোধী দল সংসদ বর্জন করলেও অনেক সদস্য এবং স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম এর আগে অন্যান্য আইন পাসের ক্ষেত্রে অধিকাংশ বিলেই জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে প্রেরণসহ সংশোধনীর নোটিশ জমা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এই বিলে কোনো নোটিশ জমা দেননি। একমাত্র রাশেদ খান মেনন ব্যক্তির পাশাপাশি দল বা সংগঠনকেও বিচারের আওতায় আনার সংশোধনীটি আনেন এবং সেটি গৃৃহীত হয়। এই সংশোধনী গৃহীত হওয়া এবং সবশেষ কণ্ঠভোটে আইনটি পাস হওয়ার পর মহাজোটের সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে টেবিল চাপড়িয়ে স্বাগত জানান। বিলটি পাসের সময় সংসদ নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে উপস্থিত ছিলেন।
রাশেদ খান মেনন তার সংশোধনীর ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, যুদ্ধাপরাধ শুধু ব্যক্তির বিষয় নয়। সংগঠনগুলো এই অপরাধ করেছে। জামায়াত দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তারাই রাজাকার, আলবদর বাহিনী তৈরি করেছে। তারা এখনও তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তারা তাদের সিদ্ধান্তের জন্য ভুল স্বীকার করেনি এবং ক্ষমা চায়নি। বরং যুদ্ধাপরাধীদের যখন বিচার চলছে তখন তাদের বাঁচানোর জন্য সারাদেশ তাণ্ডব চালাচ্ছে। তাছাড়া মাওলানা আবুল কালাম আযাদের মামলার রায়ে জামায়াত যুদ্ধপরাধের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে উল্লেখ আছে বলে তিনি উল্লেখ করে বলেন, ১৯৭১ সালের অপরাধের জন্য ব্যক্তির পাশাপাশি দলকেও নিয়ে আসার দরকার মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর উল্লেখ করে বলেন, সংবিধানে যুদ্ধাপরাধ আইনে বিচারের প্রটেকশনের অনুচ্ছেদে (অনুচ্ছেদ-৪৭(৩)) এ ব্যক্তির পাশাপাশি দল বা সংগঠনের কথা উল্লেখ আছে। মেনন মূল বিলের দফা ৩ এর অনুচ্ছেদ ১ ব্যক্তি অথবা ব্যক্তি সমষ্টির পর ‘অথবা সংগঠনসমূহ’ যুক্ত করার নতুন একটি দফা সংশোধনী বিলে যুক্ত করার সংশোধনী আনেন। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি বিদ্যমান আইনে ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির বিচারের কথা ছিল। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে এবং ২০১২ সালে পৃথক দুটি সংশোধনী আনা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। ২০০৯ সালের সংশোধনীতে ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টিকে বিচারের আওতায় আনার বিধান যুক্ত করা হয়।
মেননের সংশোধনী প্রস্তাবের পর স্পিকার আবদুল হামিদ আইনমন্ত্রীকে বক্তব্য দেয়ার অনুরোধ জানানোর পর বলেন, সংবিধানে কিন্তু ‘সংগঠন’ শব্দটিও উল্লেখ আছে। আইনমন্ত্রী জবাব দিতে গিয়েও বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির নাত্সী পার্টিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছিল, বিচার হয়েছিল এবং দলটির নেতাদের সাজা হয়েছিল। একই লক্ষ্যে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১৯৭৩ সালে অ্যাক্টের প্রটেকশনে সংগঠনকেও যুক্ত করে দিয়েছি। ফলে যদি আমরা কোনো দলের বিচার করি এ নিয়ে কোনো প্রশ্নের অবকাশ থাকবে না। এটা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। ফলে প্রস্তাবটি গ্রহণ করার ঘোষণা দেন মন্ত্রী। এরপরই কণ্ঠভোটে সংশোধনী গৃহীত হয় এবং আইনটি পাস হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস, ১৯৭৩ (সংশোধন) বিলটি গত বুধবার সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। পরে বিলটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ১ দিনের সময় দিয়ে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। বুধবার রাতেই সংসদীয় কমিটির বিশেষ বৈঠক ডেকে এতে কয়েকটি সংশোধনী এনে চূড়ান্ত করা হয়।
প্রস্তাবিত মূল বিলে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার, দণ্ডিত ব্যক্তি ও যে কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সুপ্রিমকোর্টে আপিলের সুযোগ রাখা হয়েছিল। তবে সংসদীয় কমিটি বিল থেকে ‘সংক্ষুব্ধ’ শব্দটি বাদ দেয়। বিলে অপর্যাপ্ত শাস্তি বা খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করার বিধান রাখা হয়েছে। আগের আইন অনুযায়ী, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামিপক্ষ বা দণ্ডপ্রাপ্তরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারলেও আসামি যে অভিযোগ থেকে খালাস পাবেন, কেবল ওই খালাসের রায়ের বিরুদ্ধেই সরকার আপিল করতে পারত। সংশোধিত আকারে পাসকৃত বিলের আওতায় পুরো রায়ের বিরুদ্ধেই আপিল করা যাবে।
সংসদে উত্থাপিত বিলে বলা ছিল ৪৫ দিনের মধ্যে আপিলের নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে আরও ১৫ দিন পর্যন্ত এ সময় বাড়ানো যাবে। তবে সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী ৪৫ দিন ও ১৫ দিনের বিভাজন বাদ দিয়ে একবারে ৬০ দিনের বিধান রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বিলে অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও সংসদীয় কমিটি তাদের সুপারিশে ১৪ জুলাই ২০০৯ থেকে (ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা) কার্যকরের সুপারিশ করে।
এ নিয়ে তীয়বারের মতো আইনটিতে সংশোধনী আনা হলো। বর্তমান সরকারের আমলে এর আগে আরও দুই দফা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনটিতে সংশোধনী আনা হয়। ২০০৯ সালের জুলাই এ আনা সংশোধনীতে কেবল খালাসের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ সংযোজন করা হয়। মূল আইনে শুধু আসামিপক্ষের আপিলের বিধান ছিল। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় দফা সংশোধনীতে আপিলের সময়সীমা ৬০ দিন থেকে কমিয়ে ৩০ দিন করা হয়। আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারের বিধানও সংযুক্ত করা হয়। এক ট্রাইব্যুনাল থেকে আরেক ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া যে দিন রায় হবে, সেদিনই রায়ের সত্যায়িত কপি উভয়পক্ষকে বিনামূল্যে দেয়ার বিধান করা হয়।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সব নাগরিকের আইনের সমান আশ্রয় লাভের যে অধিকার দেয়া হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ক্ষেত্রে ২১(২) ধারায় তা প্রতিফলিত হয়নি। সে জন্য ট্রাইব্যুনালের বিচারের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে আইনে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ কারণেই ২১(২) ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির আপিলের জন্য ২১(১) উপধারায় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি দ্রুত বিচার লাভের অধিকারী। তাই সংশোধনীতে আপিল নিষ্পত্তির মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে।
খবরসূত্রঃ আমারদেশ অনলাইন, ১৮ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩ [লিংক]