বিক্ষোভ সমাবেশে বিএনপি নেতৃবৃন্দ

বিএনপি নেতারা বলেছেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে সরকারই বিতর্কিত করেছে। বিচারক, প্রসিকিউটর, তদন্ত টিম সব কিছু তাদের হলেও ট্রাইব্যুনালের রায় জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের উচিত এখন এর দায়ভার নিয়ে পদত্যাগ করা। অন্যথায় জনগণই রাজপথে গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি করে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করবে।

গতকাল বিকেলে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মহানগর বিএনপি আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে নেতারা এ কথা বলেন। সরকারের দুঃশাসন ও নির্দলীয় সরকার পুনর্বহালের দাবিতে এই সমাবেশে রাজধানীর সব ওয়ার্ড থেকে দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও ফকিরেরপুল মোড় থেকে কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল রেঁস্তোরা পর্যন্ত সড়কে হাজার হাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতি দেখা যায়।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মতায় গেলে বিএনপি সব মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করবে বলে ঘোষণা দেন।

ফখরুল বলেন, যুদ্ধাপরাধীর বিচার আমরা সব সময় চেয়ে আসছি। আগামীতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ক্ষমতায় গেলে সব যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হবেই হবে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। তদন্ত করেছে তাদের লোকজন। প্রসিকিউটরও নিয়োগ দিয়েছেন তারা। রায় দিয়েছেন তাদের নিয়োগ করা লোকজন। এ রায় জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। মানে জনগণ সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই তাদের মতায় থাকার নৈতিক অধিকার নেই। তাদের উচিত তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে মতা ছেড়ে দেয়া। তা না করলে জনগণ তাদের মতা ছাড়তে বাধ্য করবে।

ফখরুল বলেন, এ সরকার সর্বেেত্র ব্যর্থ হয়েছে। দেশের সব মৌলিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। এখন তাদের ব্যর্থতা ঢাকতে যে ষড়যন্ত্র করছে তা প্রতিহত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

ফখরুল বলেন, এ সরকার বিশ্বজিৎ হত্যার বিচার করেনি। পদ্ম সেতু, ডেসটিনি, হলমার্ক, কুইক রেন্টালের নামে লুটপাট চালিয়েছে। এ লুটেরা সরকারের মতায় থাকার কোনো অধিকার নেই।

চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের জন্য সরকারকে অভিযুক্ত করে তিনি বলেন, তারা দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। দেশের মানুষ এই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা জ্ঞাপন করেছে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে তারা দেশে রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি করেছে। আমরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই, আজকের এই সঙ্কট থেকে মুক্তি পেতে হলে একমাত্র পথ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে দেশে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা। ওই আন্দোলনেই সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করা হবে।

বর্তমান সরকারকে হটাতে চলমান আন্দোলনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বানও জানান ফখরুল।

স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, সরকার যুদ্ধাপরাধীর বিচারের নামে রাজনীতি করছে। তারা নিজেরা ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এখন রায় মানছে না। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে দলের এই সমাবেশে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি প্রমাণ করে বিএনপি রাস্তায় আছে। আগামীতে তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে এমন গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি করা হবে, যখন সরকার পালানো পথ পাবে না।

শাহবাগের তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন সম্পর্কে স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, প্রথম দিকে না বুঝা গেলেও এখন প্রতীয়মান হচ্ছে এই আন্দোলন আওয়ামী লীগের স্কোয়ারে পরিণত হয়েছে। এ জন্য আমরা উদ্বিগ্ন। এ দিকে সরকার বলছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা। অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী বিচারের রায়ের প্রতি প্রকাশ্যে অনাস্থা জ্ঞাপন করছেন।

তরুণ প্রজন্মকে বলব, যুদ্ধাপরাধীর বিচার অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এটাই একমাত্র দাবি নয়। দেশে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র সুরক্ষা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবির প্রতি তরুণ প্রজন্মকে আওয়াজ তুলতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের পক্ষে আর স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে বিচারকদের পদত্যাগ দাবি করেন মওদুদ আহমদ।

মির্জা আব্বাস বলেন, ব্লগার রাজীব হত্যার বিচার হতে হবে। তবে এ জন্য একপক্ষকে দায়ী করা চলবে না। সরকার রাজীবকে হত্যা করে শাহবাগের আন্দোলনে ঘি ঢেলে দিয়েছে কি না তা নিয়েও অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে।

মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা বলেন, আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির জন্য সরকারই দায়ী। সত্যিকার অর্থে যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাইলে শেখ হাসিনাকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে এসে বলতে হবে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭২ সালে যুদ্ধাপরাধীর বিচার না করে ভুল করেছে। আমরা মনে করি, শাহবাগের আন্দোলন বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে তাদের পক্ষের লোকজনেরই বড় অনাস্থা।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে যেনতেন একটি নির্বাচনে জামায়াতকে নিতে সরকার নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে।

খোকার সভাপতিত্বে বিক্ষোভ সমাবেশে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শাহজাহান ওমর, খন্দকার মাহবুব হোসেন, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, মহানগর সদস্যসচিব আবদুস সালাম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

অঙ্গসংগঠনের নেতাদের মধ্যে যুব দল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের উপদেষ্টা ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল, মুক্তিযুদ্ধ গণপরিষদের মহাসচিব সাদেক আহমেদ খান, ছাত্র দলের সভাপতি আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান, ড. মঈন খান, সিনিয়র নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ওসমান ফারুক, মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, রুহুল আলম চৌধুরী, অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আহমেদ আজম খান, আমানউল্লাহ আমান, বরকত উল্লাহ বুলু, মাহবুব উদ্দিন খোকন, সালাহউদ্দিন আহমেদ, রুহুল কবির রিজভী, ফজলুল হক মিলন, মজিবুর রহমান সারওয়ার, মশিউর রহমান, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, আসাদুজ্জামান রিপন, হাবিবুর রহমান হাবিব, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

খবরসূত্রঃ দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ [লিংক]

Citation is loading...