ডিজিটাল দিনলিপি বা ব্লগের আড়ালে চলছে পর্নো, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ লেখালেখির চর্চা। এখানে কোনো বাছবিচার থাকছে না। যে যার মতোই এসব লিখে যাচ্ছে। ব্লগ ও ফেসবুক পেজগুলোতে পর্নোগ্রাফির ছড়াছড়ি। এসব লেখাতে আদিরসকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। আবার আদিরসের ভেতর নিয়ে আসা হয়েছে ধর্ম, ধর্মীয় রীতিনীতি ও ধর্মপ্রচারকদের। এসব নিয়ে কোনো আলাপ আলোচনা হলেই ক’দিন বন্ধ থাকার পর ফের চালু করা হয়।
ব্লগে অ্যাডাল্ট বিষয়ক লেখালেখিতে সবচেয়ে বেশি নাম কুড়িয়েছে সাম হয়্যার ইন ব্লগ। এখানে এইটিনপ্লাস ব্লগ সানন্দে গ্রহণযোগ্য। যদিও ব্লগটি পরিচালনার সাথে একজন নারী জড়িত। যার নাম জানা। তার স্বামী নরওয়েজিয়ান। নাম আরিল্ড। তিনিও ব্লগটি পরিচালনার সাথে জড়িত। বাঁধ ভেঙে দেয়ার কথা বলে এ ব্লগ সাইটটি নাস্তিকদের প্রমোট করে থাকে। এখানে যারা লিখে থাকে তারা দুই ভাগে বিভক্ত। একাংশ ‘ভাদা’ বা ‘ভারতীয় দালাল’ বা ‘আম্লিগ’। অন্যাংশ ‘ছাগু’ নামে পরিচিত। যাদের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবির করার অভিযোগ করা হয়ে থাকে। তাদের ব্লগকে বিকৃত ভাষায় ‘ছাগু’ বলা হচ্ছে।
গত ক’দিনে এসব বিষয়ে জানতে পেরেছেন পাঠকেরা। সামুতে সাধারণত সমসাময়িক অনেক বিষয় নিয়ে বিতর্ক হলেও তাদের বিশেষ কোনো নীতিমালা না থাকায় তারা নাস্তিকদের উসকে দেয়ার ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখছে। সামুর পরই পর্নো ব্লগ প্রকাশে এগিয়ে আছে আমার ব্লগ। এ ব্লগটি সরকারদলীয় একজন সমর্থক পরিচালনা করে থাকেন। এখানে থাবা বাবার মতো অসংখ্য ব্লগার তাদের মনোবিকৃতির কুৎসিত রূপ প্রকাশ করছেন অত্যন্ত নোংরাভাবে।
ব্লগের সুবিধাটা হলো নিজের আসল নাম ব্যবহার না করে লেখার সুযোগ মিলে। তাই যাচ্ছেতাই লেখা যায়। তবে এখানে একটা নীতিমালা থাকা উচিত বলে অনেকেই মনে করছেন।
আমার ব্লগে একজন ব্লগার আদি রসাত্মক বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। এখানে সমকামিতার গল্প যেমন আছে তেমনি স্টেজে জনসমক্ষে যৌনক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। নারী দেহের রসাত্মক বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ রকম একাধিক ব্লগ রয়েছে যেখানে এসব নিয়ে হামেশা কথা হচ্ছে। আবার ফেসবুকের নোটেও এ রকম নোংরা গল্প রয়েছে। আছে অ্যাডাল্ট পেজ। এইটিনপ্লাস এসব পেজে চটি সমগ্র দিয়ে ভরে রাখা হয়েছে। এসব নোংরামির সাথে অনেকেই জড়িত। কিন্তু এটি কখনো খুঁজে বের করার দরকার মনে করেনি রাষ্ট্র। এখানে কল্পকাহিনীগুলোতে বাদ রাখা হয়নি মা-বোনকেও। নিজের মা-বোনের সাথে সম্পর্ক করার মতো অরুচিকর, বিকৃত এবং অশালীন গল্প দিয়ে ভরে রাখা হয়েছে। কোনো কোনো চটি পেজ ও সাইটে দেশের জনপ্রিয় গল্পকারদের গল্প অনুসরণ করে চটি লেখা হয়েছে। ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে অশ্লীল ছবি। এ নিয়ে বিভিন্ন পরিবারে রয়েছে সঙ্কট। সমস্যা লেগেই আছে। এ থেকে মুক্তির উপায় সম্পর্কে কেউ অবহিত নন।
থাবা বাবা ওরফে রাজীব এ চক্রের অন্যতম ছিল। তার নূরানী চাপা সমগ্র এবং থাবা নামে লেখা আমার ব্লগের প্রায় সব ব্লগই ছিল আদি রসাত্মক যৌনতায় ভরপুর। সেখানে চরিত্র হিসেবে ধর্মকে হাজির করেছে থাবা বাবা। থাবা বাবার একটি গল্পে দেখা যায় ঈশ্বর নিজেই তার কন্যাদের কামলীলা উপভোগ করছেন । এ রকম তার এবং অন্যদের আরো নোংরা ও ধর্মবিরোধী, কুরুচিপূর্ণ গল্প রয়েছে।
বাংলা সেক্স স্টোরি নামে একটি ফেসবুক পেজে দেখা যাচ্ছে অন্তত ১৫ হাজার লাইক । সেখানে নানা রকমের কুরুচিপূর্ণ গল্পের ভাণ্ডার খুলে বসা হয়েছে। যেখানে সমাজে ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এমন সব গল্প রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন জন আবার পর্নোগ্রাফির লিঙ্ক শেয়ার করছেন।
উন্নত বিশ্বে পর্নোগ্রাফির সবচেয়ে বড় সূত্র হচ্ছে ওয়েবক্যাম। এটি সাধারণত ল্যাপটপ বা ডেস্কটপে থাকে। এতে প্রেমিক প্রেমিকারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিজেদের অন্তরঙ্গ বিষয়গুলোতে শেয়ার করেন। সেখান থেকে এটি তৃতীয় কোনো পক্ষ তুলে নিয়ে ওয়েবসাইটে আপলোড করতে পারেন। বিশ্বে এ রকম অনেক সাইট রয়েছে। বাংলাদেশেও দিনে ওয়েবক্যামে অ্যাডাল্ট চ্যাটিং বাড়ছে। ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হচ্ছে, এ রকম সেবা মনিটরিং করার খুবই দুরূহ। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের নজর দিতে হবে। নইলে এটা থামানো সম্ভব হবে না।
ইন্টারনেট ও ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ বেশি দামে কিনতে হলেও অল্প দামে পাওয়া নিম্নমানের মোবাইল হ্যান্ডসেটে বাজার ভরে গেছে। বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আড়াই হাজার টাকা মূল্যের হ্যান্ডসেটেই এখন ভিডিও-ছবি তোলার ব্যবস্থা রয়েছে। সে কারণে এর নেতিবাচক ব্যবহার হচ্ছে। অল্প দামি এসব হ্যান্ডসেটও পর্নো ছবি ছড়িয়ে পড়ার একটা কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। মোবাইল ফোনে তোলা ছবি ইচ্ছে হলেই যে কেউ ব্লট্রুথ বা এমএমএস করে শেয়ার করতে পারছে। তা ছাড়া নেটে তো শেয়ার করা যাচ্ছে। বিশ্বাস করে কেউ কাউকে দিলে সেটি অন্যরা বিশ্বাস ঠিক না রেখে ওয়েবসাইটে আপলোড করছে। এতে করে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এসব পর্নো।
দেশের পর্নোগ্রাফি নিয়ে খোঁজ খবর রাখেন এমন লোকদের ভাষ্য মতে, ডিজিটাল সেক্সচুয়াল ক্রাইমের সূচনা হয়েছিল দেড় দশক আগে। বাংলাদেশে ক্যামেরায় ধারণ করে প্রচারিত সেক্সচুয়াল ভিডিও কিপসটি একজন বিমানবালার। সে দেশের একজন কুখ্যাত সাবেক ছাত্রনেতার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করেন; যেটি ধারণ করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া হয়। সে সময় দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হচ্ছিল। এরপর সুমন নামে একজন প্রবাসী দেশে এসে তিন নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে তা ভিডিওতে ধারণ করে। সে সময় দেশের একটি মোবাইল ফোন অপারেটরের একজন অভ্যর্থনা নির্বাহী তার ফাঁদে পড়েন। সুমনের পর এ পথে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু হলের ছাত্রলীগ নেতা রোকন। সে প্রেমিকার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে তা ভিডিওতে ধারণ করে। তারপর সেটি বাজারে চলে আসে। রোকন ডটকম নামে এটি সর্বাধিক পরিচিত। ক্রমান্বয়ে এ ইতিহাস কেবল দীর্ঘ হয়েছে। এরপর কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর একটি ভিডিও সিডি বাজারে বের হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর ভিডিও সিডি প্রকাশিত হয় বাজারে। এসব সম্পর্ক প্রেমের টানে, প্রতারণার কারণে হয়েছে বলে সিডি বিক্রেতারা মনে করছেন।
রাজধানীতে মোবাইল ফোনে মেমোরিতে ভিডিও কিপ লোড করা হয়, এমন মার্কেট ইস্টার্ন প্লাজা ও মোতালেব প্লাজায় খবর নিয়ে জানা গেছে, দেশে এত বেশি পর্নোগ্রাফি রয়েছে যে, অনায়াসে অন্তত চার জিবির মেমোরি কার্ড ফুল করে দেয়া যায়।
আইসিডিডিআরবি গত বছর একটি জরিপ করেছে, যাতে বলা হচ্ছে দেশে ১৮ বছরের আগেই অন্তত ৫০ ভাগ শহুরে তরুণ যৌন অভিজ্ঞতা নিচ্ছে। এরা পরোক্ষভাবে প্ররোচিত হয়ে এমনটা করছে। এদের এক-তৃতীয়াংশ আবার গ্রুপ সেক্সে (দলগত যৌনকর্ম) জড়িয়ে পড়ছে। বেশির ভাগেরই সঙ্গী হচ্ছে পেশাদার যৌনকর্মী। তারা কোনো রকমের প্রকেটশন ছাড়াই এসব সম্পর্ক করছে। এতে করে তাদের মধ্যে এইডসের ঝুঁকি বাড়ছে বলেও আইসিডিডিআরবি বলেছে।
তরুণদের এইডস ঝুঁকি সম্পর্কে জাতীয় এইডস- এসটিডি কর্মসূচির পরিচালক অধ্যাপক মো: ওদুদ বলেন, যৌনাচরণ পরিবর্তন হওয়া তরুণদের এইডস ঝুঁকি বাড়ছে। এটি কমিয়ে আনার জন্য তারা কাউন্সিলিংসহ পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার কথা ভাবছেন।
আইসিডিডিআরবি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সী তরুণেরা যৌনকর্মে লিপ্ত হচ্ছে পর্নোগ্রাফি দেখে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইন্টারনেটে দক্ষিণ এশিয়ার নারী, শিশু, কিশোরীদের নিয়ে অন্তত ৫০টি পর্নো সাইট রয়েছে; যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হয় ভারত থেকে। এখানে নৈতিকতার কোনো বালাই নেই। চটি নিয়ে যেসব সাইট রয়েছে সেগুলো অসম যৌন অভিজ্ঞতা এবং ধর্মে নিষিদ্ধ নারীদের সাথে যৌন সম্পর্কের গল্পে ভরপুর।
সূত্র মতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে এ রকম ৮৪টি সাইটের তালিকা দিয়ে তা বন্ধের অনুরোধ জানানো হয়। এর পর কেবল বিডি সেক্স ফর ইউ ডট কম দেখা যাচ্ছে না। বাকি সব সাইটই দেখা যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে নেটে বাংলাদেশ, বাঙালি, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাকেন্দ্রিক যেসব পর্নো সাইট রয়েছে তার প্রায় সবই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ভারত থেকে। এ সব দেশকে ঘিরে একটি সাইট নিয়ন্ত্রণ করছে জার্মানি।
জার্মান থেকে একটি বাংলাদেশকেন্দ্রিক সাইট নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যেখানে নারীদের ছবি দেয়া আছে। আছে মোবাইল ফোন নম্বর। তা ছাড়া পরকীয়া নামে নতুন একটি সাইট রয়েছে। যেখানে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীদের ছবি দিয়ে তাদের সাথে সম্পর্ক করার জন্য জানানো হয় আমন্ত্রণ। রয়েছে একাধিক ব্লগ। এমনকি গুগলের মতো জনপ্রিয় ওয়েব মাধ্যমেরও পর্নো ব্লগ রয়েছেÑ ফটো ব্লগ ও লেখার ব্লগ দুটোই। ইয়াহুতে রয়েছে সেক্সুয়াল গ্রুপ। এতে বিডি সেক্স নামে একটি গ্রুপ রয়েছে, যার সদস্য সংখ্যা কয়েক হাজার। বিশ্বের নিত্যনতুন পর্নো সাইট সম্পর্কে তথ্য দেয়া থাকে সেখানে।
খবরসূত্রঃ দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ [লিংক]