২ থানায় ৫টি মামলা দায়ের

আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে রাজধানীর শাহবাগ ও রমনা থানায় পাঁচটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। এসব মামলায় তাকে শুক্রবারের ঘটনায় উসকানি দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়ার পরই এ মামলা দায়ের করা হয়। পাঁচটি মামলা দায়েরের প্রতিক্রিয়ায় মাহমুদুর রহমান বলেন, শাহবাগের ফ্যাসিবাদীদের মাধ্যমে সরকার সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদকে উসকে দিচ্ছে। বিচারাধীন মামলা নিয়ে শাহবাগের আন্দোলনকারীরা যা করছে তা স্বাধীন বিচারব্যবস্থার জন্য অবমাননাকর। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, তাহলে কি শাহবাগের আন্দোলনকারীরা আদালতের ঊর্ধ্বে? শাহবাগ কি প্যারালাল রাষ্ট্র? তাদের ওপর কি রাষ্ট্রের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই? আমার দেশ কার্যালয়ে গতকাল এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

গত শুক্রবার সারা দেশে মুসল্লি-পুলিশের মধ্যকার সংঘর্ষের পরিপ্রেেিত রাজধানীতে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা দায়েরূপরিপ্রেেিত এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রেেিত তার অবস্থান স্পষ্টীকরণ, শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের ব্যাখ্যা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেন। মাহমুদুর রহমান বলেন, ধর্ম ও রাসূল সা: নিয়ে অবমাননাকরীদের বিষয়ে আমার দেশ-এর সম্পদকীয় অবস্থান অনড় থাকবে। পুলিশ যেকোনো সময়ে তাকে গ্রেফতার করতে পারেÑ এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমি গ্রেফতার হতে প্রস্তুত আছি। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: ও ধর্ম নিয়ে ব্লগে কুৎসিত ও অশ্লীল ভাষায় অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিবাদে ইসলাম ধর্মাবল¤¦ীদের আগামী সোমবার রোজা রাখা ও মঙ্গলবার ‘ধর্মদ্রোহীদের ঘৃণা করি’Ñ সাদা কাগজে লিখে তা উড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। গত শুক্রবার বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় তিনি তীব্র নিন্দা জানান।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে উপস্থিত সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে মাহমুদুর রহমান বলেন, আমার বক্তব্য অবিকৃত অবস্থায় প্রচার করবেন কি না বা করার স্বাধীনতা আপনাদের আছে কি না তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। সংবাদ সম্মেলনের প্রোপট সম্পর্কে তিনি বলেন, এর আগে ২০১০ সালের পয়লা জুন আমার দেশ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেছিলাম। ওই রাতেই ফ্যাসিবাদী সরকার আমাকে গ্রেফতার করে। আজ প্রায় একই রকম প্রোপটে আবার সংবাদ সম্মেলন করছি। আজ (গতকাল) রাতে আমাকে গ্রেফতার করা হতে পারে।

মাহমুদুর রহমান বলেন, রাসূল সা: ও ইসলামকে নিয়ে যে কুৎসা প্রচার করা হয়েছে, আমার দেশ পত্রিকায় আমরা তা তুলে ধরেছি। এ ঘটনায় যেকোনো ব্যক্তি এমনকি নাস্তিকেরও নিন্দা জানানো উচিত। ধর্মীয় অনুশাসন পালন করবে কি করবে না তা যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু ধর্ম নিয়ে কুৎসা রটানোর অধিকার কারো নেই। রাসূল সা:কে অবমাননা করে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা পড়লে বোঝা যায় এদের অশ্লীলতার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। মধ্যবিত্তের অবয় এ পরিমাণ হয়েছে নাকি তথাকথিত তরুণ প্রজš§Ñ যাদের বিস্ফোরণ হয়েছেÑ তারা নিজেদের মধ্যে এ ভাষায় কথা বলে, তাদের কলম থেকে যদি এ ধরনের লেখা বের হয় তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কীÑ এ বিষয়ে তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করেন।

বিচারাধীন বিষয় নিয়ে শাহবাগে আন্দোলন হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আদালতের বিষয়টি স্পর্শকাতর। আমি দু’টি আর্টিকেল লেখায় সাত মাস জেল খেটেছি। অথচ শাহবাগে একটি বিচারাধীন মামলা নিয়ে সারাণ ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই, জবাই করো, জবাই করোÑ স্লোগান দেয়া হলোÑ তাতে আদালত অবমাননা হলো না। বিভিন্ন বিষয়ে আদালত থেকে সুয়োমোটে রুল জারি হয়। বিচারাধীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাজেদা চৌধুরীকে আদালতে মাফ চাইতে হয়েছে। তাহলে কি শাহবাগের আন্দোলনকারীরা আদালতের ঊর্ধ্বে? শাহবাগ কি প্যারালাল রাষ্ট্র? তাদের ওপর কি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেই? আমার বিরুদ্ধে উসকানির মামলা দেয়া হচ্ছে। তিনি জানতে চান, তাহলে ১৭ দিন ধরে শাহবাগে কী হচ্ছে? সেখানে যে উসকানি দেয়া হচ্ছে তা কি মিডিয়ার চোখে পড়েনি? তিনি আরো বলেন, ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর কলাম প্রকাশিত হওয়ায় গত বছরের মার্চ মাসে উচ্চ আদালত থেকে রুল জারি করা হয়েছিল। ওই রুল এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। আদালত অবিল¤ে¦ ওই সব ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সরকার ওই সব সাইট বন্ধ না করে আদালত অবমাননা করেছে। যাদের বিরুদ্ধে আদালত রুল জারি করেছিলেন, যাদেরকে ধরার কথা ছিল, সরকার তাদের নিরাপত্তায় গানম্যান দিয়েছে। জনগণের টাকায় তাদের নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে।

তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত কয়টি মামলা হয়েছে তা জানি না। জেলজুলুমের ভয় মাহমুদুর রহমানকে দেখিয়ে লাভ নেই। ২৪ ঘণ্টায় মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতারের আলটিমেটামকে আমি পরোয়া করি না।

 

তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে গত ১৩ ডিসে¤¦র রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেয়া হয়েছে। সে দিন থেকে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হতে অফিসে বসে আছি। আমাকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নির্যাতন চালিয়ে যদি মেরেও ফেলা হয় তাহলেও আমার সান্ত্বনা থাকবে যে, আমার দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য ও রাসূল সা:-এর মর্যাদা রার জন্য মরেছি। এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন হবে।

শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, শাহবাগের আন্দোলন নিয়ে আমার দেশ পত্রিকায় ‘ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। এ সংবাদের ব্যাখ্যা হচ্ছেÑ আমরা ফ্যাসিবাদ বলিনি। পদধ্বনি ও ফ্যাসিবাদ এক বিষয় নয়। এ প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান আরো উল্লেখ করেন : এক সময়ে শাহবাগে ফ্যাসিবাদের মৃদু পদধ্বনি ছিল। এখন সেই পদধ্বনির আওয়াজ বেড়েছে। তার প্রমাণ হচ্ছেÑ তারা বিভিন্ন পত্রিকার কপি পুড়িয়েছে। গতকাল চট্টগ্রামে পুলিশের সামনে আমার দেশ কার্যালয় ভেঙে চুরমার করে দেয়া হয়েছে। নয়া দিগন্ত পত্রিকা ও দিগন্ত টিভি আক্রান্ত হয়েছে। এটাই হলো ফ্যাসিবাদ। একটা অনুল্লেখ্য, জমায়েতকে গণমাধ্যম ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করেছে। একটি দু’টি মিডিয়া ছাড়া সব মিডিয়া জমায়েতকে সাপোর্ট করেছে। এই দু-একটি মিডিয়ার রিপোর্ট আপনারা সহ্য করতে পারলেন না? তিনি আরো জানতে চান, এক আমার দেশ কি বাংলাদেশের অন্য সব মিডিয়া থেকে শক্তিশালী? তাহলে কেন এক আমার দেশ বন্ধ করার পাঁয়তারা হচ্ছে। প্রসঙ্গত তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ হচ্ছে : আমার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারবে না, আমার বিশ্বাসের বাইরে কারো কোনো বিশ্বাস থাকতে পারবে না। অথচ এজাতীয় কথাই এখন শাহবাগে উচ্চারিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, এ ঘটনা প্রমাণ করে ১৭ দিন আগে আমার দেশ পত্রিকায় যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে তা আজ সত্য প্রমাণিত। রাসূল সা:-এর বিরুদ্ধে যারা কথা বলেছে, আমার দেশ তাদের নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিপোর্টে কোথাও লেখা হয়নি তাদের সাজা দেয়া হোক, ফাঁসি দেয়া হোক। এমনকি মতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ ওলামা লীগ সংবাদ সম্মেলন করে ব্লগার ডা. এমরান এইচ সরকারকে ফাঁসির দাবি জানিয়েছে। তিনি বলেন, তাহলে আমার দেশ উসকানি দিলো কোথায়? উসকানি দিয়েছে আওয়ামী ওলামা লীগ। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, ধর্ম অবমাননা নিয়ে আমার দেশ পত্রিকার অবস্থান অব্যাহত থাকবে। আমি জেলে থাকি বা বাইরে থাকি ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সম্পাদকীয় অবস্থান পরিবর্তন হবে না। কারণ, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও আদালতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছি।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশবাসীর প্রতি দুটি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, হজরত মোহাম্মদ সা: সোমবার জš§গ্রহণ ও মৃত্যুবরণ করেছেন। শাহবাগের বিপথগামী তথাকথিত ব্লগাররা ইসলাম ও রাসূল সা:কে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় অবমাননা করেছে, আক্রমণ করেছে, সম্মানহানি করেছে তার প্রতিবাদে সোমবার এক দিন নফল রোজ রাখবেন এবং মঙ্গলবার সাদা কাগজে ‘ধর্মদ্রোহীদের ঘৃণা করি’ বাক্য লেখা কাগজ সারা দেশে ছড়িয়ে দিন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে পাল্টা প্রশ্ন করেন, নয়া দিগন্ত কার্যালয়ে যখন আগুন দেয়া হয়েছিল, আমার দেশ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, তখন কি আপনারা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন?

খবরসূত্রঃ দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ [লিংক]

Citation is loading...