শাহবাগের গণজাগরণ চত্বরের নাম ভাঙিয়ে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের কাছ থেকে গণহারে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলেই জামায়াতপন্থী ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নাম তুলে দেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি এমন অভিযোগ এসেছে দেশের বেশির ভাগ জেলা থেকেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারি দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরাই মাথায় কাপড় বেঁধে ব্লগার সেজে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হচ্ছেন। আন্দোলনকারীদের দৈনন্দিন খাবার, পানীয়, ওষুধসহ অন্যান্য খরচের কথা বলে চাঁদা আদায় করলেও আদায়কৃত চাঁদার কতটা সংশ্লিষ্টরা পাচ্ছেন সে প্রশ্নও তুলেছেন চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তিরা।

বিভিন্নপর্যায়ের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনকারীদের জন্য খাবার ও ওষুধ কেনার নামে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা চাওয়া হচ্ছে। যেসব ব্যবসায়ী-শিল্পপতি দাবি অনুযায়ী চাঁদা পরিশোধে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন তাদের নাম জামায়াতপন্থী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় তুলে দেয়া হচ্ছে। চাঁদা দাবির সময় তারা বয়কটের তালিকায় লিপিবদ্ধ হওয়া সরকারি দলের নেতাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামগুলোকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন বলেও জানা গেছে।

জামায়াত সমর্থকদের প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে ইতোমধ্যে কয়েক শ’ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেছেন শাহবাগের আন্দোলনকারীরা। এসব প্রতিষ্ঠান বয়কটের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি হুমকি-ধমকি দেয়াও অব্যাহত রয়েছে। গণজাগরণ চত্বরের আশপাশে এসব প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়ে টাঙানো হয়েছে বড় বড় ব্যানার-ফেস্টুন। প্রচার করা হচ্ছে লিফলেট-প্রচারপত্র। কিছুক্ষণ পরপর ঘোষণা দেয়া হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের নাম। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই তা তুলে দেয়া হচ্ছে তালিকায়। আবার মোটা অঙ্কের চাঁদার বিনিময়ে ব্যানার থেকে নাম মুছে ফেলার ঘটনাও ঘটছে।

নাম প্রকাশ করতে অপারগতা জানিয়ে লালবাগের একজন ব্যবসায়ী গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, মাথায় কাপড় বাঁধা কয়েকজন অপরিচিত যুবককে সাথে নিয়ে সরকারি দলের স্থানীয়পর্যায়ের দু’জন নেতা সোমবার আমার অফিসে আসেন। মাথায় কাপড় বাঁধা যুবকদের শাহবাগ আন্দোলনের ব্লগার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তারা আন্দোলনকারীদের জন্য এক বেলার খাবার দাবি করেন। ৪৫ হাজার লোকের এক বেলা খাবার ১০০ টাকা হারে ৪৫ লাখ টাকা লাগবে বলে জানান তারা। হুমকি দেন চাহিদা অনুযায়ী চাঁদা দেয়া না হলে আমার কোম্পানিকে জামায়াতি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হবে এবং হামলাও হতে পারে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন তারা। শেষ পর্যন্ত কত টাকায় রফা হয়েছে তা না জানালেও মনে অনেক কষ্ট নিয়েই বিষয়টি মীমাংসা করেছেন বলে জানান ওই ব্যবসায়ী।

প্রায় একই রকমের অভিযোগ করেন গাজীপুরের একটি ওষুধ কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি জানান, এ সেক্টরের ব্যবসায়ী নেতাদের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা নির্ধারণ করে অন্য সবার মতো তাকেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে শাহবাগের আন্দোলনকারীদের খাবার সরবরাহের জন্য এ চাঁদা দিতে হবে। ব্যবসায় করতে হলে চাঁদা না দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে ওই শিল্পপতির মন্তব্য, এসব দেখার জন্যই বুঝি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম? তার দেয়া চাঁদার কত অংশ আন্দোলনকারীরা পাবেন সে ব্যাপারেও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

গণজাগরণ চত্বরের নাম ভাঙিয়ে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের কাছ থেকে ব্যাপক হারে চাঁদাবাজির কথা স্বীকার করে নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে এফবিসিসিআইর একজন পরিচালক গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, গণজাগরণ চত্বরের নাম ভাঙিয়ে যারা চাঁদাবাজি করছেন তারাও সরকারেরই লোক। তিনি বলেন, চাঁদা না দিলে তালিকায় নাম উঠছে, আবার মোটা অঙ্কের চাঁদা দেয়ার পর তালিকা থেকে নাম বাদও পড়ছে। ব্যবসায়ীরা অবিলম্বে এই চাঁদাবাজি বন্ধে পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

খবরসূত্রঃ দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ [লিংক]

Citation is loading...