শাহবাগে পুলিশ পাহারায় আন্দোলনরত কথিত ব্লগাররা মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) ও ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করে যে ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন সেসব নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অন্যান্য বিচারপতির কাছে বিতরণের অভিযোগ ওঠায় চরম বিপাকে পড়েছেন হাইকোর্টের এক বিচারপতি। প্রচণ্ড ধর্মবিদ্বেষী ও নষ্ট চরিত্রের ব্লগার রাজীবকে জাতীয় বীর আখ্যা দিয়ে বাম ও আওয়ামী সমর্থক আইনজীবীরা বলেছেন, রাজীবকে নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত কুত্সা অন্যান্য বিচারপতির কাছে বিতরণ করে ওই বিচারপতি শুধু বিচারকের আচরণবিধি লঙ্ঘন করেননি, তিনি দেশদ্রোহীর মতো কাজ করেছেন। সভ্যতা ও সামাজিক সুরক্ষার স্বার্থে তাকে চলে যেতে হবে। তাদের দাবি—শাহবাগের ব্লগারদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে এ দেশের জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বিচারপতি মিজানুর রহমান ভূঞা। তাই শাহবাগের আন্দোলনরতদের চাওয়া তথা দেশের জনগণের চাওয়া অনুযায়ী বিচারপতির পদ থেকে চলে যেতে হবে। আওয়ামপন্থী আইনজীবীরা এ নিয়ে প্রধান বিচারপতি বরাবর নালিশও করেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, রাজীব জাতীয় বীর। তাকে অপমান করে এ বিচারপতি পুরো দেশকে অপমান করেছেন। তাই তার পদত্যাগ দাবি করছি। তবে তাকে ট্রাইব্যুনাল থেকে পদত্যাগী বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের স্কাইপ কেলেঙ্কারির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়া হলে তিনি বলেন, একজন বিচারপতি যে কারও কাছ থেকে বিচারাধীন বিষয়ে পরামর্শ নিতে পারেন। এতে আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয় না। তিনি আমার দেশ-এ প্রকাশিত স্কাইপ কেলেঙ্কারির ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর ষড়যন্ত্র বলেও দাবি করেন।
শাহবাগে আন্দোলনরতদের নেতৃত্বে থাকা এক ব্লগার রাজীব গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নিহত হন। এরপর তাকে মুরতাদ আখ্যা দিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্লগার রাজীব ‘থাবা বাবা’ ছদ্মনামে প্রধানত খ্রিস্টান মালিকানাধীন ‘সামহোয়ারইন’ ব্লগে মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এবং ইসলাম ধর্মকে নিয়ে চরম কটাক্ষপূর্ণ ও অশালীন লেখা লেখেন। তিনি ইসলামের মৌলিক নীতিকে আক্রমণের পাশাপাশি অযথাই রাসুলকে (সা.) অশ্রাব্য ভাষায় আক্রমণ করেন। পরে দৈনিক আমার দেশ-এ এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদন দেখা যায়, শাহবাগে আন্দোলনরত কিছু ব্লগার ইসলাম ও হজরত মোহাম্মদ (সা.)-কে অশালীন ভাষায় গালাগাল করেছেন। তাদের লেখার ভাষা এতটাই নিম্নরুচির, যা পড়লে ধর্মমত নির্বিশেষে কোনো বিবেকবান মানুষই স্থির থাকতে পারবেন না। এসব ব্লগার নিজেদের নাস্তিক দাবি করলেও তাদের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু একমাত্র ইসলাম ধর্ম ও মহানবী (সা.)। এ বিষয়টি পত্রিকায় প্রকাশের পর দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। ধর্মপ্রাণ মানুষ শাহবাগের কথিত ব্লগারদের এমন ধৃষ্টতার বিচার চেয়ে রাস্তায় নামেন। নাস্তিক ব্লগার রাজীবকে নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন বিচারপতি মিজানুল ইসলাম ভূঞা বিভিন্ন বিচারপতির কাছে পাঠিয়েছেন মর্মে সংবাদ প্রকাশ করে আওয়ামী সমর্থক নিউজ এজেন্সি বিডি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম। পরে এ বিষয়টিকে পুঁজি করে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা তার পদত্যাগ দাবি করেন। তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলও গঠন করার দাবি জানান তারা। তাদের এ আবদারের সঙ্গে সুর মেলান বাম মনোভাবাপন্ন রাজনীতিক ও আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদ। তিনি ওই বিচারপতির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান। এছাড়া মহাজোটের সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে তার পদত্যাগ দাবি করেন। তবে বিএনপি সমর্থক সিনিয়র আইনজীবীরা বলেছেন, মহানবীকে অপমান করে লেখা নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বিতরণ করে ওই বিচারপতি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেননি। তারা বলেন, বিষয়টি কোনোভাবেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। ওই বিচারপতি হয়তো পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি বিতরণ করেছেন মাত্র। এখানে তার নিজস্ব কোনো বক্তব্য ছিল না। তারা অভিযোগ করেন, বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের দায়ের করা অভিযোগের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। স্কাইপ কেলেঙ্কারির পর ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম পদত্যাগ করেন। অথচ হাইকোর্টের বিচারপতি পদে থেকে যান তিনি।
এ বিষয়ে আমার দেশ-এর কাছে এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সিনিয়র অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, যারা আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে, মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি করে তাদের বিরুদ্ধে এসব আইনজীবী কোনো বক্তব্য দেন না। উল্টো একজন বিচারপতি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন কপি করে বিলি করেছেন বলে অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়েছেন। এটা একরকম ধৃষ্টতা। তিনি বলেন, যদি ওই বিচারপতি কাজটি করেও থাকেন, তাতে বিচারপতিদের কোড অব কন্ডাক্ট তিনি লঙ্ঘন করেননি। এখানে বিষয়টি কোনোভাবেই রাজনৈতিক নয়। সম্পূর্ণ ব্যাপারটি ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগের সঙ্গে জড়িত। এটাকে অজুহাত হিসেবে নিয়ে ওই বিচারপতির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করা হলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
তিনি বলেন, এর চেয়ে জঘন্য অভিযোগ এনে আমরা অনেক বিচারপতির পদত্যাগ ও প্রধান বিচারপতির কাছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু সেসব অভিযোগ আমলে নেয়া হয়নি। তিনি শাহবাগে আন্দোলনরত বাম ও আওয়ামী কর্মীদের চাওয়া একান্তই তাদের দলীয় বলেও মন্তব্য করেন।
সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, একজন বিচারপতি স্থায়ী হওয়ার পর একমাত্র অসদাচরণের কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়। অন্য কোনো কারণে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নেই। ইসলাম ধর্মকে অবমাননাকারী ব্লগারদের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ধর্মীয়। এখানে ধর্মবিশ্বাস ও আবেগ জড়িত। এটা বিচারিক কোনো বিষয় না। একটি পত্রিকার কপি বিতরণ করেছে এমন অভিযোগ তুলে একজন বিচারপতির অপসারণ চাওয়া যায় বলে আমি মনে করি না।
তিনি বলেন, ব্যাপারটা কিন্তু বিচারপতির ব্যক্তিগত কোনো কিছু না। তিনি হয়তো একটি ধর্মীয় ব্যাপার একভাবে দেখছেন, অন্যজন অন্যভাবে দেখছেন। তিনি ধর্ম বিদ্বেষের নমুনাসহ পত্রিকায় ছাপা একটি কপি অন্য বিচারপতিদের সরবরাহ করতেই পারেন। এতে অসদাচরণের মতো কোনো কিছু ঘটেনি। ব্যাপারটাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সবার জন্য কল্যাণ হবে।
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার বলেন, আমি মনে করি বিচারপতির বাক স্বাধীনতা আছে। ইসলাম সম্পর্কে নাস্তিকদের ঔদ্ধত্য নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অন্য কারও কাছে সরবরাহ করে তিনি কোনো দোষ করেননি। এ দেশের মানুষ যেমন স্বাধীনতা প্রিয়, তেমনি ধর্মপ্রিয়। নাস্তিক ব্লগাররা যা বলেছে ও করছে, তা বন্ধ না হলে দেশের মানুষ রুখে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, এমন ঠুনকো অভিযোগ তুলে একজন বিচারপতিকে হয়রানি করা কোনোভাবেই ঠিক হবে না। এটা বন্ধ না হলে জনতা রুখে দাঁড়াতে পারে।
প্রসঙ্গত, গত ডিসেম্বরে আমার দেশ-এ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপ কেলেঙ্কারি প্রকাশ হয়েছিল। যেখানে দেখা যায়, নিজামুল হক বিচারাধীন বিষয় নিয়ে তার প্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে শলাপরামর্শ করছেন। এ ঘটনার পর ওই বিচারপতি ট্রাইব্যুনাল থেকে পদত্যাগ করলেও হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে তাকে রেখে দেয়া হয়। ওই কেলেঙ্কারির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানায়নি এ আইনজীবীরা। হাইকোর্ট বিভাগের আরেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের বিরুদ্ধে অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। সংসদে তাকে ইমপিচমেন্টের দাবি পর্যন্ত তুলেছে মহাজোটের সংসদ সদস্যরা। এ সময়ও নীরব ছিলেন তারা। এখন একটি ধর্মীয় বিষয়কে ইস্যু করে মাঠ গরম করার চেষ্টা করছেন তারা। আওয়ামী লীগের দলীয় অবস্থানের কারণে নিজেদের সরাসরি ইসলামের বিপক্ষ শক্তি হিসেবে জাহির করছেন।
সূত্রঃ আমার দেশ, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ [লিংক]